কেন্দ্রীয় বাজেট : সর্বত্রই ভারতের অর্থব্যবস্থার একটি সংকটপূর্ণ প্রেক্ষাপট


কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হবে ভারতের অর্থব্যবস্থার একটি সংকটপূর্ণ প্রেক্ষাপটে। এই সংকটের অন্তত চারটি প্রধান বৈশিষ্ট রয়েছে যা আলোচনার দাবি রাখে। অর্থব্যবস্থার সমস্যার এই বৈশিষ্টগুলির প্রতি অর্থমন্ত্রী কতটা মনোযোগী হবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে। আপাতত এই নিবন্ধে আমরা এই সমস্যাগুলির প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় বাজেটের অভিমুখ কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা করব। ভারতের বর্তমান আর্থিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটের যে মূল বিষয়— সরকারি আয় ও ব্যয়— তার গতিপ্রকৃতি আমরা বোঝার চেষ্টা করব।

অর্থব্যবস্থার সংকটের কথা উঠলেই মিডিয়া ও রাজনীতির কারবারিদের আলোচনায় প্রথমেই উঠে আসে আর্থিক বৃদ্ধির হারের চড়াই-উৎরাই-এর কথা। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান দফতরের তথ্য অনুযায়ী— ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ হতে চলেছে। ২০১৬-১৭ সালে এই বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২ শতাংশ যা ২০১৮-১৯ সালে কমে হয় ৬.৬ শতাংশ এবং ২০১৯-২০ সালে তা আরও কমে ৫ শতাংশে এসে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা বিগত ১১ বছরে সর্বনিম্ন।

ই নিরিখে দুটি কথা পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। প্রথম, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন যে তিনি কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করে দেবেন। কবে দ্বিগুণ হবে, ভারতের ঋণগ্রস্ত দরিদ্র কৃষক তা জানে না। আপাতত জানা যাচ্ছে যে— কৃষিতে বৃদ্ধির হার ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ২.৮ শতাংশ হবে, যা ২০১৮-১৯ সালে ছিল ২.৯২ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতি ঘোষণা করেছিলেন যার মধ্য দিয়ে দেশে নতুন শিল্পের (ম্যানুফাকচারিং) জোয়ার আসবে বলে দাবি করা হয়েছিল। জোয়ার আসেনি, আপাতত শিল্পে ভাটার টান, বৃদ্ধির হার ১.৯৮ শতাংশ।

  • আর্থিক বৃদ্ধির হার তলানিতে, বেকারত্বের হার ঊর্ধ্বগামী। এই পরিস্থিতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে বাধ্য। সরকার অবশ্য চায় না যে এই তথ্য জনসমক্ষে আসুক। তাই তারা ভোগ্যপণ্যের উপর ব্যয় সংক্রান্ত জাতীয় নমুনা সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সংবাদপত্রে এই রিপোর্ট ফাঁস হলে দেখা যায় যে— ১৯৭২-৭৩ সালের পরে প্রথমবার ২০১৭-১৮ সালে পরিবারের মাথা পিছু গড় ব্যয় কমে গিয়েছে।
  • ২০১১-১২ সালে একজন ব্যক্তি গড়ে ১৫০১ টাকা মাসে ভোগ্যপণ্যে খরচ করতেন, যা ২০১৭-১৮ সালে কমে হয়েছে ১৪৪৬ টাকা (২০০৯-১০ সালের অর্থমূল্যে এই তুলনা করা হয়েছে)।
  • ২০১১-১২ এবং ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে গ্রামীণ ভারতে এই খরচ কমেছে ৮.৮ শতাংশ, এবং শহরে এই খরচ বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামীণ ভারতে প্রবল ভাবে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

কৃষি সংকট, কৃষক আত্মহত্যা, গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের বাড়তে থাকা স্রোত এই ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস হলে দারিদ্র বাড়ে, কারণ আমাদের দেশে দারিদ্র পরিমাপ করা হয় এই খরচের নিরিখে। অপ্রকাশিত ফাঁস হওয়া কেন্দ্রীয় রিপোর্টের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদরা গণনা করে দেখেছেন যে— ২০১১-১২ সালে যেখানে গ্রামীণ ভারতে দারিদ্রের হার ছিল ২৫.৭ শতাংশ তা ২০১৭-১৮ সালে বেড়ে হয়েছে ২৯.৬ শতাংশ। সমগ্র ভারতের ক্ষেত্রেও দারিদ্রের হার ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২২.৮ শতাংশ (সূত্র: লাইভমিন্ট)। একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের মতন তথাকথিত আর্থিক ভাবে উদীয়মান দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে, এর থেকে লজ্জার কথা আর কী হতে পারে। দারিদ্রের হার বৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে, দেশে আর্থিক সংকটের গভীরতা নিছক আর্থিক বৃদ্ধির হারের হিসেবের বাইরে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকা গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ব্যাঙ্কিং সঙ্কট

সার্বিক এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের আবহে বেশ কিছু বছর ধরে চলতে থাকা ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণের সমস্যার সমাধান হয়নি। ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রের মোট প্রদান করা ঋণের মধ্যে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৯.৩ শতাংশ অনাদায়ী ঋণ ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল ১২.৩ শতাংশ। অনাদায়ী ঋণের বোঝা বওয়া ব্যাঙ্কগুলিকে তাদের মুনাফার বড়ো অংশ এই খাতে বরাদ্দ করতে হয়েছে। তদুপরি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা অনুযায়ী ঋণ প্রদান করার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সুতরাং ব্যাঙ্ক থেকে প্রদেয় ঋণের বৃদ্ধির হার কমে এসেছে। সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ ঋণের বৃদ্ধির হার হয়েছে ৮.৭ শতাংশ, যা মার্চ ২০১৯-এ ছিল ১৩.২ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার সেপ্টেম্বর মাসে ছিল মাত্র ৪.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, বর্তমানে বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের তুলনায় বেশি ঋণ প্রদান করছে। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক আরও দুর্বল হবে এবং দেশে আর্থিক সংকটের সম্ভাবনা বাড়বে। বাজেটে অর্থমন্ত্রী এই চার সমস্যাকে কী ভাবে দেখবেন সেটাই এখন দেখার।

আর্থিক বৃদ্ধির রাস্তায় ফিরতে গেলে বাজেটে অনেকগুলো স্বচ্ছতা জরুরি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close