গুজব থেকেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন

     

কোভিড-১৯ আতঙ্কে বিশ্ব কাঁপছে। দেশেও মহামারি ঘোষিত। এক দিকে বাড়ছে উদ্বেগ। অন্য দিকে সতর্কতার নানাবিধ পরামর্শ। তাতে কী! উত্তরবঙ্গগামী স্টেট বাসে ভর দুপুরে মুখে রজনীগন্ধা গুটকা ও অন্য হাতে তুলসি জর্দা নিয়ে বেদম সুখে মুখ নাড়ছেন এক যুবক। মাঝে মাঝেই গলা বের করে থুতু ফেলছেন বাসের জানালা দিয়ে। করোনার বিষয়ে প্রশ্ন করায় সহজে জবাব দিলেন, ‘‘জানালা খুলে রাখা ভালো। ভাইরাস চলে যায় !’’ আবার, শহরে প্রয়োজনে আসা বেলডাঙার এক কিশোর অটোচালককের কাছে পয়সা ফেরত নিতে গিয়ে বলছে, ‘‘টাকায় ভাইরাস আছে, আমাকে পয়সা দিন।’’ দৌলতাবাদের এক ব্যবসায়ী অনায়াসেই করোনার জ্ঞান জাহির করছেন, ‘‘বাইরের বাতাসের রোগ, এখানে কি হবে? পোল্ট্রি খাওয়া বন্ধ করেছি আমরা।’’

আসলে বিপুল সংখ্যার মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতাবোধ এমনই। এদেরই ভোটে শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রের ইমারত দাঁড়িয়ে। এঁদের অজ্ঞতা ও অসচেতন মানসিকতা পরিবর্তনের প্রধান শিক্ষক সেই সরকারই। আজ কঠিন পরীক্ষার সামনে বেরিয়ে পড়ছে সরকার নিয়ন্ত্রিত মেশিনারির সীমাবদ্ধতার কথা। স্বাস্থ্যপরিষেবার দুর্বলতাকে আড়াল করে তৎপরতা ও নিয়ন্ত্রণ বিধির জোর চালু। ভয়ের বাজার সরগরম। মানুষের সামনে একচিলতে সম্ভাবনার আলো কেউ জ্বালতে পারছে না। শেষমেশ গৃহবন্দি হয়ে থাকাকেই আপাত প্রতিষেধক মেনে নিয়েছে মানুষ। আক্রান্তের মৃত্যুভয়। আক্রমনের বাইরের থাকা মানুষের সংক্রমনের ভয়। এই অভিঘাতে দাঁড়িয়ে অবিচল আয়ুরেখা।

এত কোটি মানুষের দেশে বিপদের দিনে প্রাথমিক ভাবে সরকারের হাত থেকে দুটি ব্রহ্মাস্ত্র বেরিয়ে এসেছে। এক সেফ হ্যান্ড চ্যালেঞ্জ ও অন্যটি কোভিড -১৯ সলিউসন চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতা। হাত ধুলেই মানুষ বাঁচবে? সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে মোবাইলের প্রতি কলে নষ্ট হচ্ছে পাক্কা ত্রিশ সেকেন্ড। হেল্পলাইন নাম্বারে ফোন করে কি পাওয়া যাচ্ছে? কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের পরামর্শ। সংগৃহীত সেই কাশি শিষ্টাচারবোধ এমন অতিসতর্কতার আকার নিয়েছে যে মানুষ পথে–ঘাটে স্বাভাবিক ভাবে হাঁচতে ভয় পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্যরা আক্রমণাত্মক শরীরী ভাষার আশ্রয় নিচ্ছেন। ফ্যানের হাওয়ায় ঠান্ডা লেগে সামান্য সর্দি আক্রান্ত মানুষও ভয় পাচ্ছে যে তাঁকে করোনার শিকার ভেবে বিচ্ছিন্নতার ঠিকানায় না পৌঁছে যেতে হয়। তাই অসুখ গোপনের ঝুঁকি থাকছেই। রোগ আক্রান্ত না হতেই স্বেচ্ছায় একাকী হচ্ছেন একদল মানুষ। যারা ঘোষিত করোনা শিকার তারা আবার পালানোর চেষ্টা করছে যানবাহন চড়ে। রোগ ছড়িয়ে দেওয়ার এক শিহরণ জাগানো বিকৃত আনন্দের উৎসব চারদিকে। আক্রান্তদের গণতান্ত্রিক আস্থা, সাধারণ জ্ঞান এবং বিশ্বাসের রুটিন বদলে গেছে। আচরণবিজ্ঞান অনুসারে, নিশ্চিত ভয় এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিক্রিয়াতে স্নায়বিক পরিবর্তন ও অন্যরকম সজাগতা ও ধ্বংসাত্মক ব্যাবহারের দিকে পরিচালিত করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close